বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ওয়ানডেতে থাকছেন, টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছাড়ছেন নিগার গুলশানে আ’লীগের মিছিলের তথ্য ছিল, তবে সময়টা আন্দাজ করতে পারেনি পুলিশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৯৩ বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে মানুষের গল্প, লোডশেডিং নিয়ে আলোচিত সিনেমা বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আসিফ নজরুলের ভূমিকা, সম্মতি ছিল বিসিবিরও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ও পরিবারের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ মামলা চবি আলাওল হলের প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি, কক্ষে তালা নতুন ধারার ছাত্ররাজনীতিতে সফল হওয়ার প্রত্যয় ছাত্রদল সভাপতির মক্কায় সম্ভাব্য হামলার বিরল সতর্কতা, হুথি-সৌদি উত্তেজনা তুঙ্গে
  • বিমা খাতে ‘ডন’ দেলোয়ার

    সিন্ডিকেট ও অনিয়মে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ৪ কোটি টাকার কাজ নিয়ে অভিযোগ

    সিন্ডিকেট ও অনিয়মে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ৪ কোটি টাকার কাজ নিয়ে অভিযোগ
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    দেশের বিমা খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনার দায়িত্বে থাকা খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেই জেঁকে বসেছে এক ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) উপ পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়ার নাম। দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং কোটি কোটি টাকার কাজ বিনা টেন্ডারে পাইয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন তিনি। তার এই একক আধিপত্য ও ‘ওপেন সিক্রেট’ দুর্নীতির কারণে ধস নামতে বসেছে সাধারণ গ্রাহকের আস্থার জায়গায়, জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো বিমা খাত।

    ৪ কোটির আসবাবপত্র ক্রয়ে টেন্ডার গায়েবঃ

    অনুসন্ধানে দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে তাজা ও গুরুতর অভিযোগটি সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘনের। বিমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ের জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ের একটি বড় কাজ কোনো ধরনের দরপত্র (টেন্ডার) ছাড়াই দেলোয়ার তার আপন শ্যালক নাসের নেওয়াজকে পাইয়ে দিয়েছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে। এই নজিরবিহীন জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ লুটের ঘটনায় খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরে-বাইরে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

    ‘ভিশন সার্ভে’র আড়ালে জিম্মি বিমা কোম্পানিঃ

    বিমা খাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হলো ‘ক্ষতিপূরণ বা দাবি নিষ্পত্তি’, যা নির্ধারিত হয় সার্ভে রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে। আর এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নিজের পকেটে পুরতে দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন ‘ভিশন সার্ভে ইন্সপেকশন লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে।

    অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে রয়েছে দেলোয়ারের সরাসরি পারিবারিক সম্পৃক্ততা। বিভিন্ন বিমা কোম্পানিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিয়ে, এই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সার্ভে করাতে অঘোষিত ও প্রচণ্ড প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিমা বিশেষজ্ঞ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি নির্দিষ্ট সার্ভে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে বাধ্য করা সরাসরি বাজার দখলের শামিল। এর ফলে গ্রাহক ও কোম্পানি—উভয় পক্ষই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

    পরিবারতন্ত্র ও অশিক্ষিতদের পুনর্বাসনঃ

    শুধু ব্যবসায়িক সুবিধাই নয়, বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন বিমা কোম্পানিতে দেলোয়ারের একাধিক নিকটাত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার তথ্য মিলেছে। যোগ্যতা কিংবা স্বাভাবিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে, নামমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “এগুলো যদি কাকতালীয়ও বলা হয়, তবুও সংখ্যাটা এত বেশি যে প্রভাব খাটানোর বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট।”

    সিন্ডিকেটে হত্যা মামলার আসামি ও রাজনৈতিক সংযোগঃ

    প্রভাবের জাল আরও শক্তিশালী করতে প্রশাসন ও ব্যবসার সাথে যুক্ত করা হয়েছে রাজনীতিকে। ‘ভিশন সার্ভে ইন্সপেকশন লিমিটেড’-এর পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করা হয়েছে নাঙ্গলকোট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু ইউসুফকে। বিমা খাতের মতো একটি পেশাদার জায়গায় এমন বিতর্কিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সদর দক্ষিণ থানায় দায়ের হওয়া একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় এই আবু ইউসুফ এজাহারনামীয় আসামি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

    ভয়ের সংস্কৃতি ও ‘ওপেন সিক্রেটঃ

    দেলোয়ারের এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পান খাতের অন্য কর্মকর্তারা। কোনো কর্মকর্তা বা কোম্পানি ভিন্নমত পোষণ করলে বা বিকল্প সার্ভে প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে চাইলে তাদের ওপর নেমে আসে প্রশাসনিক ও নানামুখী হয়রানির খড়্গ। ফলে পুরো সেক্টরে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

    স্বার্থের সংঘাত ও আইনি লঙ্ঘনঃ

    আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা হয়ে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রভাব খাটানো এবং নিজের শ্যালককে টেন্ডার ছাড়া কাজ পাইয়ে দেওয়া স্পষ্টত ‘স্বার্থের সংঘাত’ এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, যা দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

    অভিযুক্তের রহস্যজনক নীরবতাঃ

    এইসব লোমহর্ষক অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগের বিষয়ে উপ পরিচালক দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোন ও সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই রহস্যজনক নীরবতাই প্রমাণ করে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!

    মুক্তি কোন পথে?

    বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে:

     * একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় বা উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

     * ‘ভিশন সার্ভে’সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ফরেনসিক অডিট জরুরি।

     * ৪ কোটি টাকার আসবাবপত্র ক্রয়ের টেন্ডার জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট তদন্ত করতে হবে।

     * তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়াকে দ্রুত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।

    লুটেরাদের কবল থেকে দেশের বিমা খাতকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপই একমাত্র পথ।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন