বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ওয়ানডেতে থাকছেন, টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছাড়ছেন নিগার গুলশানে আ’লীগের মিছিলের তথ্য ছিল, তবে সময়টা আন্দাজ করতে পারেনি পুলিশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৯৩ বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে মানুষের গল্প, লোডশেডিং নিয়ে আলোচিত সিনেমা বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আসিফ নজরুলের ভূমিকা, সম্মতি ছিল বিসিবিরও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ও পরিবারের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ মামলা চবি আলাওল হলের প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি, কক্ষে তালা নতুন ধারার ছাত্ররাজনীতিতে সফল হওয়ার প্রত্যয় ছাত্রদল সভাপতির মক্কায় সম্ভাব্য হামলার বিরল সতর্কতা, হুথি-সৌদি উত্তেজনা তুঙ্গে
  • এইচআইভি মোকাবিলায় বিজ্ঞান, মানবিকতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতাই পথ

    এইচআইভি মোকাবিলায় বিজ্ঞান, মানবিকতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতাই পথ
    ছবি: এআই
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    এইচআইভি এখন আর শুধু একটি প্রাণঘাতী রোগের নাম নয়; এটি বিশ্বস্বাস্থ্য, মানবাধিকার, স্বাস্থ্যসেবায় সমতা এবং সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিষয়। কয়েক দশকের গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এইচআইভি সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। নিয়মিত ও কার্যকর অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART) গ্রহণ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এমনকি চিকিৎসার মাধ্যমে ভাইরাসের পরিমাণ এতটাই কমিয়ে আনা সম্ভব যে যৌন সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে না—বিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘Undetectable = Untransmittable’ বা U=U হিসেবে পরিচিত।

    তবু এই অর্জনকে সাফল্যের শেষ ধাপ ভাবার সুযোগ নেই। কারণ চিকিৎসা সহজলভ্য হলেও বিশ্বের অনেক মানুষ এখনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত। কোথাও অর্থের অভাব, কোথাও স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল অবকাঠামো, আবার কোথাও সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য মানুষকে চিকিৎসার বাইরে রাখছে।

    বিশেষ করে এইচআইভি নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো কলঙ্ক ও বৈষম্য। একজন মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন—এই তথ্য জানার পর তাকে সমাজ, কর্মক্ষেত্র কিংবা পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যদি আক্রান্ত মানুষকেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

    তাই এইচআইভি মোকাবিলায় শুধু ওষুধ নয়, প্রয়োজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এইচআইভি কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে ছড়ায় না, চিকিৎসা কীভাবে কাজ করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা উচিত—এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ও নির্ভুল তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

    স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। একজন এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের শুধু ওষুধ পেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসার সঙ্গেও তার সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

    এখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ওষুধ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি, দ্রুত পরীক্ষা, উন্নত ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের ভ্যাকসিন বা নিরাময়ের গবেষণা এইচআইভি মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। কিন্তু গবেষণার সুফল যদি কেবল ধনী দেশ বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।

    বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এইচআইভি প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি।

    বিশ্বস্বাস্থ্যের বড় শিক্ষা হলো—কোনো রোগের বিরুদ্ধে একটি দেশ একা দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। সংক্রামক রোগ সীমান্ত মানে না। ফলে গবেষণা, তথ্য বিনিময়, ওষুধের সহজলভ্যতা, অর্থায়ন এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

    এইচআইভি মোকাবিলায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—প্রতিরোধ। নিরাপদ যৌন আচরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী HIV পরীক্ষা, সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর আধুনিক পদ্ধতি এবং চিকিৎসার আওতায় দ্রুত নিয়ে আসা—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন। শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নয়, সংক্রমণের আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

    সবচেয়ে বড় কথা, এইচআইভি আক্রান্ত মানুষকে রোগ হিসেবে দেখা যাবে না; তাকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তার অধিকার, মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। একজন আক্রান্ত মানুষকে অপমান বা বিচ্ছিন্ন করা কোনো জনস্বাস্থ্য নীতি হতে পারে না।

    বিজ্ঞান আমাদের চিকিৎসার পথ দেখিয়েছে, কিন্তু মানবিকতা সেই চিকিৎসাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। তাই এইচআইভির বিরুদ্ধে আগামী দিনের লড়াই শুধু ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল কিংবা গবেষণাগারে হবে না; লড়াই হবে সমাজের কুসংস্কার, বৈষম্য ও ভুল ধারণার বিরুদ্ধেও।

    এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অর্জন প্রমাণ করে—বিজ্ঞান, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করলে অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। এখন প্রয়োজন সেই অগ্রগতিকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ বিশ্বস্বাস্থ্য তখনই সত্যিকার অর্থে সফল হবে, যখন চিকিৎসা শুধু আবিষ্কৃত হবে না—প্রয়োজনের সময় তা প্রত্যেক মানুষের নাগালের মধ্যেও থাকবে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ