মৌলভীবাজারে পাহাড়-টিলা কেটে রিসোর্টের হিড়িক, অনুমোদনের হিসাব নেই

মৌলভীবাজারে পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল কেটে একের পর এক রিসোর্ট গড়ে উঠছে। গত কয়েক বছরে জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে এসবের বেশির ভাগের অনুমোদন ও বৈধতার তথ্য নেই সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে। বিশেষ করে পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলে তৈরি হয়েছে শতাধিক রিসোর্ট।
কোথাও কয়েক শতক জমিতে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করেই দেওয়া হয়েছে ‘রিসোর্ট’ নাম। এসব স্থাপনা তৈরির আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব যেসব সরকারি দপ্তরের, তাদের কার্যকর তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে পরিবেশের ক্ষতি করে অবাধে বাড়ছে রিসোর্ট ব্যবসা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ২০১৩ সালে প্রায় ১৩ একর জায়গাজুড়ে প্রথম পাঁচ তারকা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী কয়েক বছরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিভিন্ন ক্যাটাগরির আরও কিছু রিসোর্ট গড়ে ওঠে।
তবে গত তিন-চার বছরে পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে বাসাবাড়ি, পাহাড়-টিলা কেটে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করে সেগুলোকে রিসোর্ট হিসেবে পরিচালনা শুরু করেন অনেকে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর সরকারি বৈধতা ও অনুমোদনের তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছেও নেই।
সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট রয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। এখানে রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় ১০৩টি। এর মধ্যে শুধু রাধানগর এলাকাতেই রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টি রিসোর্ট।
স্থানীয় মূলধারার রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা জানান, শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক সময় কয়েক শতক জমি বহিরাগতদের কাছে বিক্রি করেন। পরে সেখানে এক বা একাধিক কক্ষ নির্মাণ করে রিসোর্টের নামে ব্যবসা শুরু করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এলাকাবাসী কিংবা পর্যটনসংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শও করা হয় না।
তাঁদের অভিযোগ, অনেক নামধারী রিসোর্টে সিসি ক্যামেরা বা নৈশপ্রহরীর ব্যবস্থাও নেই। মালিকরাই অনেক সময় ম্যানেজার হিসেবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারির সুযোগও সীমিত।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টে একটি ঘটনার পর রাতারাতি রিসোর্টের নাম পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর অথবা জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ রিসোর্টের মালিক তা করেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টের পরিচালক বলেন, ‘মৌলভীবাজারের পর্যটনের উন্নতির কথা চিন্তা করেই গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানের রিসোর্টের যাত্রা শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন ক্যাটাগরির রিসোর্ট তৈরি হতে থাকে। আমরা সরকারের সব আইন মেনে রিসোর্ট পরিচালনা করছি। অথচ এখন দেখা যায়, বেপরোয়াভাবে রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব রিসোর্ট কীভাবে হচ্ছে, কার অনুমতি নিয়ে হচ্ছে, তা তদারকি করা খুবই প্রয়োজন।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমদ বলেন, ‘বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, আমাদের জেলায় প্রায় ২০০টি রিসোর্ট। এসব রিসোর্টের মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১০০টির বেশি আছে। কীভাবে এত রিসোর্ট হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। অথচ প্রকৃত অর্থে শ্রীমঙ্গলে মাত্র কয়েকটি রিসোর্ট আছে, যাদের রিসোর্ট বলা যায়। অনেকেই তিন-চারটি কক্ষ নিয়ে রিসোর্ট নাম দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন। এসব রিসোর্ট কারা করছেন, তা আমাদের জানা নেই।’
সেলিম আহমদ জানান, শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রায় ৬০টি রিসোর্ট। তাঁর ভাষ্য, একটি রিসোর্ট করতে সামান্যতম অনুমতিও যদি প্রত্যেককে নিতে হতো, তাহলে রিসোর্টের সংখ্যা এতটা বাড়ত না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সময় পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল এলাকা কেটে রিসোর্ট বানানো হচ্ছে। কীভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে রিসোর্ট বানানো হয়, তা আমরা জানতে চাই। প্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করে টিলার ওপর কেন রিসোর্ট বানানো হয়। যারা রিসোর্ট বানাচ্ছেন, তাঁরা বৈধ না অবৈধভাবে তা করছেন, আজ পর্যন্ত সরকারের কাউকে তা তদারকি করতে দেখিনি। যত সময় যাচ্ছে, বেপরোয়াভাবে রিসোর্ট বানানোর সংখ্যা বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করা। একটি রিসোর্ট তৈরির জন্য সরকারের অনেকগুলো দপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তা পরোয়া করছেন না।’
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে ৬০টি রিসোর্ট ছাড়পত্র নিয়েছে। যেসব রিসোর্ট ২০ কক্ষ বা তার অধিক, এসব রিসোর্টের ছাড়পত্র আমরা দিই। বাকি রিসোর্টগুলো কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে, এসব আমাদের জানা নেই।’
জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘পাঁচ তারকা ও তিন তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্টগুলো আমরা দেখাশোনা করি। যাঁরা রিসোর্ট করছেন, হয়তো তাঁরা কোনো না কোনো বিভাগ থেকে অনুমতি নিচ্ছেন। আবার না-ও নিতে পারেন। এসব বিষয় জানা নেই।’
পর্যটননির্ভর মৌলভীবাজারে রিসোর্ট ব্যবসার প্রসার স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও পাহাড়-টিলা ও বনাঞ্চল কেটে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ পরিবেশের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিসোর্ট নির্মাণ ও পরিচালনায় অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।