বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

মাকে সম্মান গর্বের, স্ত্রীকে সম্মান লজ্জার কেন?

মাকে সম্মান গর্বের, স্ত্রীকে সম্মান লজ্জার কেন?
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বাংলা সমাজে “মা” শব্দটি আবেগ, ত্যাগ ও শ্রদ্ধার প্রতীক। একজন পুরুষ মায়ের প্রতি ভক্তি ও দায়িত্ব পালন করলে তা প্রশংসিত হয়। কিন্তু একই পুরুষ যখন স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান দেখান, তখন অনেক সময় তাকে “স্ত্রী ভক্ত” বা “বউয়ের কথায় চলে” বলে কটাক্ষ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দ্বৈত মানসিকতা পারিবারিক ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

  • দক্ষিণ এশীয় সমাজ দীর্ঘদিন পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় পরিচালিত।
  • মা’কে সম্মান দেওয়া ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
  • যৌথ পরিবারে ছেলেদের ওপর মায়ের আবেগিক নির্ভরতা বেশি থাকে।
  • বিয়ের পর স্ত্রীকে গুরুত্ব দিলে অনেক সময় তা “মা অবহেলা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
  • সমাজবিজ্ঞান বলছে, বিয়ে একটি নতুন পরিবার ইউনিট তৈরি করে—এটি অবমূল্যায়ন নয়, নতুন দায়িত্ব গ্রহণ।

মা ভক্তি কেন গৌরবের

১. মা সন্তানকে জন্ম দেন ও লালন-পালন করেন।
২. নৈতিক শিক্ষা ও আবেগিক বিকাশে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
৩. মনোবিজ্ঞান মতে, মায়ের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
৪. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ।

তাই মায়ের প্রতি ভক্তি ও দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে সম্মানের।

স্ত্রী ভক্তি কেন কটাক্ষের শিকার

  • স্ত্রীকে গুরুত্ব দিলে পুরুষ দুর্বল হয়ে যায়—এমন ধারণা প্রচলিত।
  • বন্ধুমহল বা আত্মীয়দের কটাক্ষ।
  • পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় আবেগ প্রকাশকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।

তবে গবেষণা বলছে, পারস্পরিক সম্মান ও সমর্থন থাকলে পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্য ও স্থিতি বাড়ে।

দাম্পত্য সম্পর্কের গুরুত্ব

  • স্ত্রী শুধু সঙ্গী নন, সহযাত্রী।
  • সুখ-দুঃখের ভাগীদার ও সন্তানের মা।
  • মানসিক আশ্রয় ও বার্ধক্যের সাথী।
  • গবেষণায় দেখা গেছে, স্ত্রীর সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগ পুরুষের মানসিক চাপ কমায়।

স্ত্রীকে সম্মান দেওয়া দুর্বলতা নয়, বরং পরিপূর্ণতা।

প্রয়োজন ভারসাম্য

  • মায়ের ভরণ-পোষণ ও সম্মান নিশ্চিত করা
  • স্ত্রীর অধিকার ও আবেগকে মূল্য দেওয়া
  • তুলনা নয়, সম্পর্কের স্বতন্ত্রতা বোঝা

পরিবার বিশেষজ্ঞদের মতে—“Hierarchy নয়, Harmony” প্রয়োজন।

সন্তানের দৃষ্টিকোণ

  • বাবা যদি একজনকে সম্মান করে অন্যজনকে অবমূল্যায়ন করেন, শিশুর মনে বিকৃত ধারণা জন্মায়।
  • সুস্থ পরিবারে দাদি ও মা—উভয়েই সম্মানিত হন।
  • এ ভারসাম্যই ভবিষ্যৎ সমাজের ভিত্তি।

গবেষণা যা বলছে

১.পারস্পরিক সম্মান দাম্পত্য স্থায়িত্ব বাড়ায়।
২.পরিবারে প্রতিটি সম্পর্কের আলাদা ভূমিকা আছে।
৩.আবেগিক সমর্থন মানসিক চাপ কমায়।
৪.বার্ধক্যে পুরুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন স্ত্রীর ওপর।

মা জীবন শুরুতে, স্ত্রী জীবন চলার পথে—দুজনই অপরিহার্য।

সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজন

  • স্ত্রীকে সম্মান করা দুর্বলতা নয়
  • দাম্পত্য ভালোবাসা লজ্জার নয়
  • মা ও স্ত্রী প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
  • দায়িত্ব ভাগাভাগি স্বাভাবিক

বাস্তব জীবনের করণীয়

১.মা ও স্ত্রীর জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ
২.আর্থিক দায়িত্বে স্বচ্ছতা
৩.কারো কথা অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করা
৪.সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্ত্রীকে যুক্ত করা
৫.মায়ের সম্মান প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা

মা জীবন দেন, স্ত্রী জীবন গড়ে।
মা শিকড়, স্ত্রী ছায়া।

একজন ছাড়া জন্ম অসম্ভব, অন্যজন ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। তাই লজ্জা নয়—গর্ব হোক দু’জনের প্রতিই ভক্তিতে। ভারসাম্যই হোক সুন্দর পরিবার, সুস্থ সমাজ ও মানবিক পুরুষত্বের আসল পরিচয়।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন