বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

আবু সাঈদকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, ট্রাইব্যুনালের রায়ে যা বলা হয়েছে

আবু সাঈদকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, ট্রাইব্যুনালের রায়ে যা বলা হয়েছে
ছবি: ফাইল
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ঘটনার বিভিন্ন দিক বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ৮০৯ পৃষ্ঠার এই রায়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, চিকিৎসকের সাক্ষ্য, ভিডিওচিত্র, আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট পর্যালোচনা করে আদালত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু সাঈদ। এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালে জমা পড়ে। পরে অভিযোগ গঠন, বিচার কার্যক্রম শেষে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণা করা হয় এবং ১৪ জুন প্রকাশ করা হয় পূর্ণাঙ্গ রায়।

রায়ে বলা হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, চিকিৎসকের সাক্ষ্য, সুরতহাল, আলোকচিত্র ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে বন্দুকের গুলিতে সৃষ্ট একাধিক আঘাত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শকের কারণেই আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির ক্ষত, ধাতব পেলেট এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গুরুতর ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আসামিপক্ষ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সিভিল সার্জনের স্বাক্ষর না থাকা এবং এক্স-রে না করার বিষয়টি তুলে ধরলেও ট্রাইব্যুনাল এসব আপত্তি গ্রহণ করেননি। আদালতের মতে, এগুলো প্রক্রিয়াগত বিষয় হলেও চিকিৎসা-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে না। একইভাবে সুরতহাল প্রতিবেদনে গুলির আঘাত বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলেও সেটিকে প্রাথমিক নথি হিসেবে বিবেচনা করে আদালত ময়নাতদন্তকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

টি-শার্টে দৃশ্যমান গুলির চিহ্ন না থাকার যুক্তিও খারিজ করে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, উদ্ধার হওয়া কাপড়টি পুরো পোশাকের অংশ ছিল না। বরং শরীরে পাওয়া গুলির ক্ষত এবং ধাতব পেলেটই হত্যার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ভিডিওচিত্র ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে পুলিশের গুলিতেই আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছে। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার সময় তিনি দুই হাত প্রসারিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তার পক্ষ থেকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ছিল সংবিধানসম্মত শান্তিপূর্ণ নাগরিক আন্দোলন। কিছু বিক্ষোভকারীর হাতে লাঠি বা আত্মরক্ষামূলক সরঞ্জাম থাকলেও পুরো আন্দোলনকে সশস্ত্র বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

রায়ে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভিডিও, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, প্রায় ১৪ মিটার দূর থেকে ধাতব পেলেটযুক্ত শটগান দিয়ে অন্তত দুইবার গুলি করে আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়।

সব তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনার পর ট্রাইব্যুনাল মন্তব্য করেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত ও ব্যাপক আক্রমণের অংশ। তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে 'হত্যা'-এর সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, রায়টি যথাযথ হয়েছে বলে তার মত। এ কারণে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রয়োজন দেখছেন না।

উল্লেখ্য, এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাঁচজনকে ১০ বছরের, আটজনকে পাঁচ বছরের এবং ১১ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া একজনের হাজতবাসকে সাজা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন