চ্যাটবটকে যা বলবেন না, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় থাকুন সতর্ক

এআই চ্যাটবট এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সার্চ করা, লেখালেখি, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ—বিভিন্ন কাজে মানুষ নিয়মিত চ্যাটবট ব্যবহার করছেন। স্বাভাবিক কথোপকথনের মতো উত্তর পাওয়ায় অনেকে আবার ব্যক্তিগত চিন্তা, সমস্যা ও নানা অভিজ্ঞতাও চ্যাটবটের সঙ্গে শেয়ার করছেন।
তবে চ্যাটবট যতই মানুষের মতো কথা বলুক, এটিকে ব্যক্তিগত ডায়েরি বা গোপন আলাপের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কোনো এআই সেবায় তথ্য দেওয়ার আগে সেই প্ল্যাটফর্মের ডেটা ও প্রাইভেসি নীতি সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। বিশেষ করে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা অনলাইনে শেয়ার করার পর এর ব্যবহার বা সংরক্ষণের ওপর ব্যবহারকারীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নাও থাকতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান-সেন্টারড এআইসহ বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তাই চ্যাটবট ব্যবহারের সময় নিচের তথ্যগুলো শেয়ার করার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকা ভালো।
১. জাতীয় পরিচয়পত্র ও পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য
নাম, ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্য কিংবা অন্য কোনো সরকারি পরিচয়পত্রের বিস্তারিত চ্যাটবটে না দেওয়াই নিরাপদ।
অনেকে সিভি বা চাকরির আবেদনপত্র সম্পাদনার জন্য পুরো নথি আপলোড করেন। এসব নথিতে ফোন নম্বর, ঠিকানা, জন্মতারিখ বা পরিচয় শনাক্ত করা যায়—এমন তথ্য থাকলে সম্ভব হলে আগে সেগুলো মুছে বা আড়াল করে নেওয়া উচিত।
২. ব্যক্তিগত ও গোপনীয় কথোপকথন
এআইয়ের সঙ্গে সহজে কথা বলা যায় বলে অনেকেই সম্পর্কের সমস্যা, পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের গোপন বিষয় বিস্তারিত লিখে ফেলেন। কিন্তু চ্যাটবটকে মানুষের মতো ব্যক্তিগত বন্ধু বা গোপনীয় পরামর্শদাতা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
কোনো বিষয় নিয়ে পরামর্শ প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ না করে পরিস্থিতির সাধারণ বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ঝুঁকিও কমে।
৩. চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নথি
কোনো মেডিক্যাল রিপোর্টের কঠিন শব্দের অর্থ বোঝা বা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ তথ্য জানতে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পুরো মেডিক্যাল ইতিহাস, প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার রিপোর্ট বা ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যায়—এমন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সরাসরি আপলোড করার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
প্রয়োজনে নাম, ঠিকানা, রোগীর নম্বর বা অন্যান্য পরিচয় শনাক্তকারী তথ্য বাদ দিয়ে সাধারণ প্রশ্ন করা যেতে পারে।
৪. অফিসের গোপন নথি
কাজের সুবিধার জন্য অনেকে অফিসের রিপোর্ট, চুক্তিপত্র, ক্লায়েন্টের তথ্য বা অভ্যন্তরীণ নথি চ্যাটবটে দিয়ে সারাংশ কিংবা সম্পাদনা করান। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য কোনো তৃতীয় পক্ষের এআই সেবায় দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে ক্লায়েন্টের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক নথি, পাসওয়ার্ড, অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট এবং গোপন চুক্তির তথ্য অনুমতি ছাড়া শেয়ার করা উচিত নয়।
৫. ব্যাংক ও আর্থিক তথ্য
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের নম্বর, পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড, পে-স্লিপ, করসংক্রান্ত নথি কিংবা অন্যান্য আর্থিক পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য চ্যাটবটে না দেওয়াই নিরাপদ।
এ ধরনের তথ্য ফাঁস হলে প্রতারণা, পরিচয় চুরি বা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কোনো আর্থিক নথি বিশ্লেষণের প্রয়োজন হলে সংবেদনশীল তথ্য মুছে বা আড়াল করে নেওয়া ভালো।
ভুল করে সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে ফেললে
কোনো চ্যাটবটে ভুল করে ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে ফেললে আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের প্রাইভেসি ও ডেটা সেটিংস পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্ল্যাটফর্মে কথোপকথন মুছে ফেলার সুবিধা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিও করা যায়।
ব্যাংক কার্ডের নম্বর, পিন, পাসওয়ার্ড বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য প্রকাশ হয়ে গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এআই প্রযুক্তি কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। তবে সুবিধার পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চ্যাটবট মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও সেখানে দেওয়া তথ্যকে ব্যক্তিগত ডায়েরি বা সম্পূর্ণ গোপন আলাপের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা না করাই নিরাপদ। প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যায়, কিন্তু পরিচয়, অর্থ, স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি।