বরফ গলনে বদলাচ্ছে পৃথিবীর আকৃতি, মেরু উঠছে—বিষুবীয় ভূমি নামছে

পৃথিবীকে সাধারণত গোলাকার হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি নিখুঁত গোলক নয়। নিজ অক্ষে ঘূর্ণনের কারণে বিষুবীয় অঞ্চলে পৃথিবী কিছুটা স্ফীত এবং মেরু অঞ্চলে চাপা। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর এই আকৃতিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটছে। মেরু অঞ্চল আগের তুলনায় দ্রুত ওপরে উঠছে, অন্যদিকে বিষুবীয় অঞ্চলের ভূমি কিছুটা নিচে নামছে। ফলে পৃথিবীর কঠিন শিলাস্তরের আকৃতি ধীরে ধীরে কম চ্যাপ্টা হয়ে উঠছে।
গ্রিসের অ্যারিস্টটল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ববিদ ক্রিস্টোফার কোটসাকিসের নেতৃত্বে করা গবেষণায় ১৯৯৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা গ্লোবাল ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (জিএনএসএস) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের ভূমি বছরে গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার হারে ওপরে উঠছিল। ২০১৫ সালের দিকে সেই হার বেড়ে প্রায় ১ মিলিমিটারে পৌঁছায়। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে মেরু অঞ্চলের ভূত্বক ওপরে ওঠার গতি বেড়েছে।
বিজ্ঞানীরা এর অন্যতম কারণ হিসেবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়াকে দেখছেন। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর গলে যাওয়ার ফলে সেখানকার ভূত্বকের ওপর থাকা বিপুল ওজন কমে যাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ভূত্বক ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসছে। ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বরফের চাপ কমে যাওয়ার পর ভূত্বকের পুনরুত্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
অন্যদিকে, গলে যাওয়া বরফের পানি সমুদ্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সমুদ্র ও সমুদ্রতলের ওপর ভরের বণ্টন বদলে যাচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত পানি জমার কারণে নিচের দিকে চাপ বাড়ছে, যার ফলে সমুদ্রতলের ভূত্বক কিছুটা নিচে নামতে পারে।
এই পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর কঠিন অংশের আকৃতিতে একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পৃথিবীর কঠিন শিলাস্তরের আকৃতি এবং এর মহাকর্ষীয় আকৃতি একই বিষয় নয়।
পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রকে বোঝাতে বিজ্ঞানীরা ‘জিওয়েড’ ধারণা ব্যবহার করেন। এটি পৃথিবীর ভেতর ও ওপরের ভরের বণ্টনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কাল্পনিক আকৃতি। গবেষণায় দেখা গেছে, কঠিন পৃথিবী মেরু অঞ্চলে ওপরে উঠে তুলনামূলকভাবে কম চ্যাপ্টা হওয়ার সময় জিওয়েডের আকৃতিতে বিপরীত ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
কোটসাকিসের ব্যাখ্যায়, বিষয়টি প্রথমে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও বাস্তবে দুটি পরিবর্তন একই সঙ্গে সম্ভব। বরফ গলে মেরু অঞ্চল থেকে ভর সরে যাওয়ায় সেখানকার ভূত্বক ওপরে উঠছে। একই সময়ে সেই পানি নিম্ন অক্ষাংশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় পৃথিবীর ভরবণ্টন ও মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটছে।
গবেষণাটি তাই শুধু পৃথিবীর মহাকর্ষীয় তথ্য বিশ্লেষণ করেই এর আকৃতির পরিবর্তন বোঝার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। পৃথিবীর ভূত্বক কোথায় কতটা উঠছে বা নামছে, সে সম্পর্কিত সরাসরি পর্যবেক্ষণও এ ধরনের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এসব পরিবর্তন খুবই ক্ষুদ্র মনে হলেও দীর্ঘ সময়ের হিসাবে এগুলো পৃথিবীর আকৃতি, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং ভরবণ্টন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলার হার বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ ও মহাকর্ষীয় ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও এ গবেষণা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।
সূত্র: জার্নাল অফ জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: সলিড আর্থ