ডলারের নিলাম—সংকটের চেয়ে আস্থাই এখন বড় প্রশ্ন

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম বাড়ছে—এমন আলোচনা যখন অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ডলার নিলাম ভিন্ন একটি চিত্র সামনে এনেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২ কোটি মার্কিন ডলার বিক্রির ঘোষণা দিয়েও শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করতে পেরেছে। বাকি ৮৫ লাখ ডলার অবিক্রীত থেকে গেছে। প্রশ্ন হলো, তাহলে বাজারে ডলারের প্রকৃত সংকট কতটা?
নিলামে ছয়টি ব্যাংক অংশ নিয়ে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার কেনার প্রস্তাব দেয় এবং তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৩৫ পয়সার মধ্যে। এই ফলাফল অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে—ডলারের দাম নিয়ে বাজারে আলোচনা থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের জন্য তীব্র ও সর্বব্যাপী চাপ রয়েছে, এমন চিত্র নিলামে পাওয়া যায়নি।
তবে একটি নিলামের ফলাফল দিয়ে পুরো বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতি বিচার করাও ঠিক হবে না। ডলারের চাহিদা প্রতিদিনের আমদানি দায়, জ্বালানি আমদানি, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য এবং ভবিষ্যৎ লেনদেনের প্রত্যাশার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমে গেলে আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। ফলে সামনে ডলারের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আইএমএফের বিপিএম৬ হিসাব অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ২৫ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রিজার্ভের অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারে স্বচ্ছতা ও আস্থা নিশ্চিত করা। ডলারের প্রকৃত চাহিদা কত, ব্যাংকগুলোর হাতে কতটা বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে এবং বিনিময় হার কোন বাস্তবতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কারণ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে গুজব ও ভবিষ্যৎ দর নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় বাস্তব চাহিদার চেয়েও বেশি চাপ তৈরি করতে পারে। ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও ব্যাংকগুলো যদি মনে করে সামনে ডলারের দাম আরও বাড়বে, তাহলে প্রয়োজনের আগেই ডলার ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক নিলাম তাই শুধু ডলার বিক্রির একটি কার্যক্রম নয়; এটি বাজারের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়েরও একটি উপায়। এই প্রক্রিয়া নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলে ডলারের প্রকৃত চাহিদা সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের ধারণা আরও পরিষ্কার হবে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ যথেষ্ট নয়। রপ্তানি আয় বাড়ানো, রেমিট্যান্সের বৈধ প্রবাহ আরও শক্তিশালী করা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে।
ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা শুধু একটি মুদ্রার বিনিময় হার স্থির রাখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থাও জড়িত। তাই ডলারের দাম নিয়ে আতঙ্ক কিংবা অতিরিক্ত স্বস্তি—কোনোটিই কাম্য নয়।
২ কোটি ডলার বিক্রির সুযোগ থাকার পরও ৮৫ লাখ ডলার বিক্রি না হওয়ার ঘটনা বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এখন সেই বার্তাকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাজারের তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গুজব নয়, বাস্তব তথ্যই ডলারের বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করে।