বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

সুস্থ সমাজের নির্মাণে ন্যায় ও উদারতার ভূমিকা

সুস্থ সমাজের নির্মাণে ন্যায় ও উদারতার ভূমিকা
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

একটি সমাজ তখনই সুস্থ ও সমৃদ্ধ হতে পারে, যখন সেখানে ন্যায় এবং দানশীলতার চর্চা অব্যাহত থাকে। ন্যায় মানে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা নয়, বরং প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি সমতা, সততা ও ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে দানশীলতা বা উদারতা সমাজের মধ্যে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও সহায়তার সংস্কৃতি সৃষ্টি করে। এই দুটি গুণাবলীর সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ শান্তিপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ এবং পরস্পরের সহযোগিতায় জীবন যাপন করতে পারে।
অন্যের অধিকার হরণ করা, দুর্বলকে শোষণ করা কিংবা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করার ভয়াবহতা কত কঠিন নিচের হাদিসের ভাষ্যে দেখুন-

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاتَّقُوا الشُّحَّ فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ ‏"‏ ‏.‏

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তোমরা অত্যাচার করা থেকে বিরত থাক। কেননা কিয়ামত দিবসে অত্যাচার অন্ধকারে পরিণত হবে। তোমরা কৃপণতা থেকে সাবধান হও। কেননা এ কৃপণতাই তোমাদের আগেকার কাওমকে ধ্বংস করেছে।

এ কৃপণতা তাদের খুন-খারাবী ও রক্তপাতে উৎসাহ যুগিয়েছে এবং হারাম বস্তুসমূহ হালাল জ্ঞান করতে প্রলোভন দিয়েছে। (সহিহ মুসলিমو হাদিস ২৫৭৮)
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

১. অত্যাচার (ظلم) থেকে বিরত থাকার নির্দেশ

অত্যাচারের সংজ্ঞা: ইসলামে অত্যাচার বলতে বোঝানো হয়েছে- অন্যায়ভাবে কারো অধিকার হরণ করা, আল্লাহর হুকুম অমান্য করা (যা নিজের ওপর জুলুম), অথবা সমাজে দুর্বলদের ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া। কিয়ামতের দিন এ অন্যায়গুলো অন্ধকারে (ظلمات) পরিণত হবে। অর্থাৎ—অত্যাচারী ব্যক্তি কবর ও হাশরের ময়দানে ভয়াবহ অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকবে।

সে আল্লাহর নূরের আলো থেকে বঞ্চিত হবে। তার কাজগুলো অন্ধকার হয়ে তার মুক্তির পথ বন্ধ করে দেবে। এ কথার সমর্থনে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে-
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ

‘তুমি কখনোই মনে করবে না যে, আল্লাহ জালিমদের কাজকর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪২)

২. কৃপণতা (شحّ) থেকে সাবধান থাকার নির্দেশ

শুহ্ (شحّ) শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো তীব্র কৃপণতা, যেখানে মানুষ শুধু নিজের জন্য ভোগ করতে চায়, অন্যকে কিছু দিতে চায় না, এমনকি অন্যের প্রাপ্যও গোপন করে।

কৃপণতা মানুষের ভেতর লোভ, দ্বেষ, বিদ্বেষ ও হিংসার জন্ম দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে এই কৃপণতা ধ্বংস করেছিল। কারণ তারা সম্পদের জন্য রক্তপাত করেছে। আবার সম্পদ বাঁচানোর জন্য অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। অর্থ বা স্বার্থ রক্ষার জন্য আল্লাহর হারাম জিনিসকেও হালাল ঘোষণা করেছে।

দান, যাকাত, সদকা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে সমাজে অসাম্য, বৈষম্য ও বিদ্বেষ ছড়িয়েছে।

৩. কেন অত্যাচার ও কৃপণতা এত ভয়াবহ?

অত্যাচার সমাজকে ধ্বংস করে, কারণ এটি আস্থার বন্ধন ভেঙে দেয়। জালিম যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর আদালতে তার পরিণতি অন্ধকার। কৃপণতা সমাজে দারিদ্র্য, হিংসা ও রক্তপাতের জন্ম দেয়। সম্পদ যখন কেবল কিছু লোকের হাতে জমে যায়, তখন দুর্বল জনগণ ক্ষুব্ধ হয়, আর এই বৈষম্য জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

৪. হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা 

এই হাদিস আমাদের দুইটি মৌলিক শিক্ষা দেয়— (১) ন্যায়পরায়ণ হও: কখনো অন্যের অধিকার হরণ করো না। মনে রেখো, আল্লাহ দেরি করেন কিন্তু অবহেলা করেন না। (২) দানশীল হও: কৃপণতা থেকে বাঁচো, যাকাত-সদকা দাও, দরিদ্রের পাশে দাঁড়াও।

ইসলামের দৃষ্টিতে একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে ন্যায়বিচার (অত্যাচার থেকে বিরত থাকা) এবং দানশীলতা (কৃপণতা থেকে দূরে থাকা)—এই দুটোই অপরিহার্য।


দৈএনকে/জে .আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন