শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনে বিপুল অর্থপাচার: ফিনান্সিয়াল টাইমস

গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তার শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ নতুনভাবে সামনে আসছে। একের পর এক উঠে আসা এসব অভিযোগ দেশের ভেতরে যেমন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক সাড়া ফেলছে।
সর্বশেষ এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক ফিনান্সিয়াল টাইমস। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। শুধু অর্থপাচার নয়, সরকারি নানা খাতের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার কিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল, তাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়কালে বাংলাদেশ থেকে বাইরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ চমকে দেওয়ার মতো। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, অবৈধ বিনিয়োগ এবং সম্পদ কেনাবেচার মাধ্যমে। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মহল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদন শুধু শেখ হাসিনার আমলের দুর্নীতির চিত্রই প্রকাশ করছে না, বরং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। তারা বলছেন, এখন এই অর্থপাচারের প্রকৃত হিসাব উন্মোচন এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জাতীয় স্বার্থে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই প্রতিবেদন আলোড়ন তুলেছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অর্থপাচার রোধে বাংলাদেশকে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতি ও সুশাসনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের এই চাঞ্চল্যকর হিসাব প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বিরোধীদল ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের সন্দেহ ও অভিযোগকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
পত্রিকাটির নতুন প্রকাশিত একটি ডকুমেন্টারিতে দাবি করা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অবৈধভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে।
শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’স মিসিং বিলিয়নস: স্টোলেন ইন প্লেইন সাইট’ শিরোনামের এই অনুসন্ধানী ডকুমেন্টারিতে আন্দোলনকারী, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন- কীভাবে এত বিপুল অর্থ বিদেশে চলে গেল ও আদৌ তা ফেরত আনা সম্ভব হবে কি না।
ডকুমেন্টারিতে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ছিল। বিশেষত যুক্তরাজ্য হয়ে ওঠে এই পাচারের প্রধান কেন্দ্র। লন্ডনের শক্তিশালী আর্থিক খাত ও রিয়েল এস্টেট বাজারকে টার্গেট করে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়।
ডকুমেন্টারিতে শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার পরিবারের নামও উঠে এসেছে। রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি ও সাবেক মন্ত্রী হলেও, দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় অভিযোগ ওঠে, হাসিনা ও রেহানার পরিবার বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। টিউলিপ সিদ্দিকও তদন্তের মুখে পড়েন ও মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হন।
ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, যুক্তরাজ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ৩০০টিরও বেশি সম্পত্তি রয়েছে। ব্রিটিশ অপরাধ দমন সংস্থা (এসসিএ) এরই মধ্যে প্রায় ৩৫০টি সম্পত্তি জব্দ করেছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাবে, শেখ হাসিনার সময়ে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময় সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ব্যাংক দখল করে সাবেক শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠরা। অস্ত্রের মুখে অনেক পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এরপর ওই ব্যাংকগুলো থেকে হাজার কোটি টাকার ভুয়া ঋণ দেওয়া হয় নিজেদের স্বার্থে, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার হয় হুন্ডির মাধ্যমে।
অনুমান করা হচ্ছে, ব্যাংক ও ব্যবসা খাত থেকে পাচার হওয়া এই অর্থের পরিমাণ ২৩ হাজর ৪০০ কোটি ডলার।