বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ওয়ানডেতে থাকছেন, টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব ছাড়ছেন নিগার গুলশানে আ’লীগের মিছিলের তথ্য ছিল, তবে সময়টা আন্দাজ করতে পারেনি পুলিশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৮ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৫৯৩ বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে মানুষের গল্প, লোডশেডিং নিয়ে আলোচিত সিনেমা বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আসিফ নজরুলের ভূমিকা, সম্মতি ছিল বিসিবিরও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ও পরিবারের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ মামলা চবি আলাওল হলের প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি, কক্ষে তালা নতুন ধারার ছাত্ররাজনীতিতে সফল হওয়ার প্রত্যয় ছাত্রদল সভাপতির মক্কায় সম্ভাব্য হামলার বিরল সতর্কতা, হুথি-সৌদি উত্তেজনা তুঙ্গে
  • গবেষণা: যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই ৯৩% নারী সহিংসতার শিকার

    গবেষণা: যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই ৯৩% নারী সহিংসতার শিকার
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীদের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেননি। শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিরতা, ঘরছাড়া হওয়া এবং যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের মতো অভিজ্ঞতা তাদের জীবনের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ৯৩ শতাংশই যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

    সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘কালচার অ্যান্ড সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড রিডেম্পশন: প্রিভেনশন, প্রটেকশন অ্যান্ড ন্যারেটিভ আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন এমং বাংলাদেশি স্ট্রিট বেজড ফিমেল সেক্স ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাইন্ডওয়েল রিসার্চ ল্যাব’-এর অধীনে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের গবেষক দল এতে কাজ করে।

    শৈশবের দারিদ্র্য ও সহিংসতার প্রভাব

    গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলের ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩০ জন পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীর জীবনকাহিনি ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের ১০৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ছয়টি প্রধান বিষয় চিহ্নিত করেন গবেষকরা। এগুলো হলো—ট্রমা ও নিপীড়ন, মাতৃত্ব, টিকে থাকার সংগ্রাম, সামাজিক সহায়তা, ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক।

    গবেষণায় অংশ নেওয়া সব নারীই শৈশবে চরম দারিদ্র্য ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাদের ৬৭ শতাংশকে অল্প বয়সেই বাধ্য হয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল।

    আর ৯৩ শতাংশ নারী যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

    একজন অংশগ্রহণকারী গবেষকদের বলেন, মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্কের নির্যাতনের শিকার হন। আরেক নারী জানান, কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর তাকে জোর করে যৌন পেশায় ঠেলে দেওয়া হয়।

    গবেষকদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা তাদের জীবনের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ যৌন পেশায় যুক্ত হওয়াকে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, নির্যাতন ও বঞ্চনার পর টিকে থাকার কৌশল হিসেবে এটি সামনে এসেছে।

    ট্রমায় ঝাপসা হয়েছে স্মৃতি

    গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের শৈশবের ট্রমা তাদের স্মৃতিতেও প্রভাব ফেলেছে বলে উঠে এসেছে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনাগুলো অনেকেই স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেননি। এসব স্মৃতি ছিল অস্পষ্ট, বিচ্ছিন্ন ও অতিসাধারণীকৃত।

    গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনাগুলোর ৮৫ শতাংশ স্মৃতিই ছিল এ ধরনের অতিসাধারণীকৃত স্মৃতি। মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব অনুযায়ী, গুরুতর ট্রমা মানুষের স্মৃতি সংগঠনের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে ঘটনাগুলো ধারাবাহিক জীবনকাহিনি হিসেবে মনে না থেকে বিচ্ছিন্নভাবে থেকে যেতে পারে।

    সন্তান ও সহকর্মীদের কাছ থেকে মানসিক শক্তি

    গবেষণায় দেখা গেছে, এই নারীদের টিকে থাকার লড়াই শুধু ব্যক্তিগত নয়। মাতৃত্ব, সহকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং এনজিওভিত্তিক বিভিন্ন সহায়তা তাদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে ভূমিকা রেখেছে।

    গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০ জনের মধ্যে ২৭ জন মা। তাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, সন্তানকে ঘিরে তাদের বেঁচে থাকার নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা অনেককে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানসিক শক্তি দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।

    এ ছাড়া সহকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন তারা। প্রায় ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, এনজিও পরিচালিত কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি তাদের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

    গবেষকরা এই সহায়তার সমন্বিত প্রভাবকে ‘সমষ্টিগত মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

    সামাজিক কলঙ্কও বড় সংকট

    সহায়তা পাওয়ার পরও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কলঙ্ক তাদের জীবনে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। নিজের পেশাগত পরিচয় প্রকাশ পেলে অপমানিত হওয়ার ভয়, বাসা ভাড়া পেতে সমস্যা এবং সন্তানের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তাদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে।

    গবেষকদের মতে, সামাজিকভাবে আরোপিত নেতিবাচক ধারণার কারণে অনেক নারী নিজেদের পরিচয় ও পেশা নিয়ে আত্মগ্লানি এবং মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগেন।

    প্রতিরোধে চার সুপারিশ

    যৌন পেশায় প্রবেশের পেছনে শৈশবের নির্যাতন, দারিদ্র্য ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতার ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে গবেষণায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।

    ১. ঝুঁকিতে থাকা মেয়েশিশুদের জন্য কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

    ২. গৃহহীন কিশোরীদের শোষণের শিকার হওয়ার আগেই নিরাপদ আশ্রয় ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা।

    ৩. অতিদারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা।

    ৪. পথে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ট্রমা-সচেতন সেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা।

    ‘সমস্যাটি ব্যক্তির চরিত্রের নয়, কাঠামোর’

    গবেষক ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০ জনের একজনও স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেননি। তাদের সবার জীবনেই দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, ঘরছাড়া হওয়া ও সহিংসতার মতো বিষয় পাওয়া গেছে।

    তার মতে, এসব তথ্য দেখায় যে সমস্যাটিকে শুধু ব্যক্তির চরিত্র বা সিদ্ধান্তের দৃষ্টিতে দেখলে প্রকৃত কারণ আড়াল হয়ে যায়। মূলত সামাজিক ও কাঠামোগত নানা সংকট তাদের জীবনের গতিপথকে প্রভাবিত করেছে।

    তিনি বলেন, সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হওয়া উচিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও পরিবারকে আগে থেকেই সুরক্ষা দিতে হবে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ