হামের চিকিৎসায় মহাখালী হাসপাতাল, নেই পিআইসিইউ-এনআইসিইউ; সংকটে সেবাব্যবস্থা

করোনা মহামারির সময় ঢাকার মহাখালীতে গড়ে তোলা হয়েছিল ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল। ডিএনসিসি পাইকারি কাঁচাবাজারের জন্য নির্মিত ছয়তলা ভবনটিকে তখন রূপ দেওয়া হয় কোভিড চিকিৎসাকেন্দ্রে। পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু রোগীদেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এখানে। বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ বাড়ায় হাসপাতালটিতে চলছে হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা।
তবে হামের জন্য নির্ধারিত এই হাসপাতালটিও নানা সংকটে জর্জরিত। ভবন ও অবকাঠামোর সংস্কার, পর্যাপ্ত জনবল এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—শিশু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হলেও এখানে নেই পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) ও নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (এনআইসিইউ)। নেই অপারেশন থিয়েটার কিংবা নিজস্ব ব্লাড ব্যাংকও।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালটি ঘুরে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনটির আয়তন ১ লাখ ৮০ হাজার ৫৬০ বর্গফুট। ভবনের সামনে রয়েছে পর্যাপ্ত খালি জায়গা, যেখানে গাড়ি পার্কিং ও রোগী-স্বজনদের চলাচলের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সকালে হাসপাতাল এলাকায় মানুষের উপস্থিতি থাকলেও বিকেলের দিকে তুলনামূলক নীরবতা দেখা যায়। এর মধ্যেই দূর-দূরান্ত থেকে সাইরেন বাজিয়ে একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্স এসে থামছে।
পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের দাবি
মহাখালীতে বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও একটি সাধারণ হাসপাতালের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, পানিবাহিত রোগের জন্য আইসিডিডিআর,বি, বায়ুবাহিত রোগের জন্য জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, সংক্রামক রোগের জন্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ ক্যানসার ও গ্যাস্ট্রোলিভার রোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সাধারণ রোগীদের জন্য বড় একটি জেনারেল হাসপাতাল নেই।
স্থানীয় এক দোকানি বলেন, করোনা, ডেঙ্গু কিংবা হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এই হাসপাতাল কতটা কার্যকরভাবে সংকট সামাল দিতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার ভাষ্য, গুরুতর রোগীদের এখানে রাখা সম্ভব হয় না। পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ না থাকায় অনেক শিশুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওই দোকানি আরও বলেন, বিভিন্ন পরীক্ষার জন্যও রোগীদের অন্য হাসপাতালে যেতে হয়। ডেঙ্গুর সময় রক্তের প্রয়োজন হলেও রোগীর স্বজনদের বাইরে ছুটতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুকে ভর্তি করাতে আসা সুমন মিয়া বলেন, অনেক জায়গায় ঘুরেও তার সন্তানকে ভর্তি করাতে পারেননি। পরে এই হাসপাতালে ভর্তি করানো সম্ভব হয়েছে। তবে তার মতে, এটিকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলা গেলে রোগীদের জন্য আরও বেশি উপকার হবে।
‘না হাসপাতাল, না আইসোলেশন সেন্টার’
হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করলে এখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ শয্যার ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুললে প্রায় ৫০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল করা যেতে পারে।
সেক্ষেত্রে অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউ, অবজারভেশন ওয়ার্ড, নারী-পুরুষের আলাদা ওয়ার্ড, গাইনি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিভাগ চালু করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে চিকিৎসকদের বসার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যও আলাদা বসার ব্যবস্থা সীমিত। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন পুরোপুরি হাসপাতাল কিংবা আইসোলেশন সেন্টার—কোনোটির কাঠামোতেই কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।
তাদের মতে, স্থায়ীভাবে একটি পরিকল্পনা করে হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু জরুরি পরিস্থিতিতে একেক সময় একেক রোগের চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলা দরকার।
প্রয়োজন আরও চিকিৎসক-নার্স
হাসপাতালটির জন্য আরও প্রায় ৫০ জন চিকিৎসক, ৬০ জন নার্স এবং শতাধিক আউটসোর্সিং কর্মী প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নার্সদের থাকার জন্য কোনো ডরমেটরি না থাকায় অনেকেই এখানে কাজ করতে আগ্রহী নন বলেও জানা গেছে। নিজস্ব বেতনে কাছাকাছি এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
৪০৬ হাম রোগী ভর্তি
হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল ডা. লতিফা রহমান বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ৪০৬ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১২২ জন ভর্তি হয়েছেন এবং ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮৫ জন।
রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, মূলত তিন ধরনের রোগী এখানে আসছেন। যাদের বাড়িতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে বাসায় পাঠানো হচ্ছে। যাদের বাড়িতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই বা শারীরিক অবস্থা খারাপ, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হাম আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি নিউরোলজিসহ অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে তাদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। তবে সন্ধ্যার পর গুরুতর রোগী এলে তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করে পরদিন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান তিনি।
হাসপাতালের সংকট প্রসঙ্গে পরিচালক বলেন, জনবলসহ কিছু সংকট রয়েছে। বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং সমাধানের আশা করা হচ্ছে।
হামে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৬ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মোট ১ হাজার ৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ২৮২ জন। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪২০ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬৫ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
হামের প্রকোপের মধ্যে মহাখালীর এই হাসপাতালটি অনেক রোগীর জন্য তাৎক্ষণিক আশ্রয় ও চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করলেও বিশেষায়িত সেবার ঘাটতি থাকায় গুরুতর রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল, সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত বিভাগ যুক্ত করা গেলে হাসপাতালটি দীর্ঘমেয়াদে সংক্রামক রোগের পাশাপাশি সাধারণ রোগীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।