ডমিনেজ স্টিলে আইপিও অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, পাঁচ পরিচালককে ৫ কোটি টাকা জরিমানা

প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের পাঁচ পরিচালককে মোট ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই ঘটনায় কোম্পানিটির সাবেক দুই কর্মকর্তাকে আরও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোম্পানিটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, পরিচালক সুজিত সাহা, পরিচালক রকিবুল ইসলাম এবং পরিচালক আবুল কালাম ভূঁইয়াকে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জিল্লুর রহমান এবং সাবেক কোম্পানি সচিব মো. জামির হোসেন চৌধুরীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জরিমানার পরিমাণ ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা।
বিএসইসির পরিদর্শন ও তদন্তে কোম্পানিটির আইপিও থেকে উত্তোলন করা অর্থ ব্যবহারে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০২০ সালে আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করা ৩০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়ের কথা থাকলেও অর্থ ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট আইন ও নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আইপিওর অর্থ ব্যবহারের খাত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়নি। বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন এবং জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রক্সি ভোট সংগ্রহ করে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
বিএসইসি এসব কর্মকাণ্ডকে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার মতো তথ্য গোপন ও জালিয়াতির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
তদন্তে আইপিওর অর্থে ড্রেজার কেনার বিষয়টিও উঠে এসেছে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সিএসডি ডমিনেজ-৩’ নামে একটি ড্রেজার কেনা হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালে কেনার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছরেও ড্রেজারটি কোনো ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়নি এবং এ থেকে কোম্পানি কোনো আয়ও করতে পারেনি বলে তদন্তে বলা হয়েছে।
ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক সম্পর্কেও কোম্পানির নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার অসঙ্গতি পাওয়া যায়। কোম্পানির নথিতে প্রস্তুতকারক হিসেবে সুন্দরবন শিপবিল্ডার্সের নাম উল্লেখ থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি বিএসইসিকে লিখিতভাবে জানিয়েছে, তারা ওই ড্রেজার তৈরি করেনি। এতে কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জে দেওয়া তথ্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও নরসিংদীর পলাশে অবস্থিত ডমিনেজ স্টিলের দুটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএসইসির মতে, এ ধরনের তথ্য গোপন করা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আশুলিয়ার কারখানার শেড সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও আইপিওর অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে বিএসইসি। তদন্তে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে আইপিওর অর্থ থেকে প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, জরিমানার অর্থ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কমিশনে জমা দিতে হবে।
ডমিনেজ স্টিল ২০২০ সালে আইপিওর মাধ্যমে ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ছিল ১০ টাকা। কোম্পানিটি জানিয়েছিল, উত্তোলিত অর্থ দিয়ে ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন, প্ল্যান্ট ও মেশিনারিজ কেনা এবং আইপিওসংক্রান্ত ব্যয় মেটানো হবে।
‘বি’ শ্রেণিভুক্ত ডমিনেজ স্টিলের পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে কোম্পানিটির ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ শেয়ার।